আকাশ নিবির : আধুনিক বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে সিনেমার পরই সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম ধরা হয় টেলিভিশনকে। আমাদের রয়েছে টিভি নাটকের দারুণ এক ইতিহাস। বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, রূপনগর, সকাল সন্ধ্যা, এইসব দিনরাত্রি, জন্মভূমি, দেয়াল, সংশপ্তক, ঢাকায় থাকি এবং পরবর্তী সময়ে রঙের মানুষসহ অনেক জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকের প্রতিটা পর্বের জন্য সপ্তাহব্যাপী অপেক্ষা করত বাংলাদেশের প্রায় সব পরিবার।
বিটিভির এক ঘন্টার নাটকের জন্য সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করতো মানুষ। এখন আর সেদিন নাই। এখন চলছে ইউটিউবের যুগ। টিভি নাটকের কনটেন্ট এ খোদ টেলিভিশন চ্যানেলেরই কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এজন্সি নামের দালালদের হাত ধরে ইউটিউবের জন্য নির্মিত নাটকগুলো দেদারছে প্রচার হচ্ছে টেলিভিশনে। এসব নাটকের গল্প, বিষয়-বস্তু, সংলাপের কোনো বালাই নেই। কোথাও কোথাও চলে অতি নীচু স্তরের ভাড়ামো। আবার কোথাও আরোপিতভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে অশ্লীলতা। এমনই একটি নাটক মোহন আহমেদ পরিচালিত ‘ডেটিং সেটিং’।
নাটকের নাম দেখেই বিষয়বস্তু সম্পর্কে বোঝা যায়। তবে বিষয়বস্তু আরো ভয়ঙ্কর। নাটকের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘রুম ডেট’। সমস্যাটা এখানেই। টেলিভিশন কনটেন্ট এর সাবজেক্ট কেমন হওয়া উচিত। কোন ধরনের কনটেন্ট টেলিভিশনের উপযোগী আর কোনটা উপযোগী না সেটার সম্পর্কেই বেসিক কোনো জ্ঞান নেই এখনকার পরিচালকদের।
তেমনি এই ঈদে মোহন আহমেদের গল্প, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় নাটকের সংলাপ লিখেছেন গোলাম সারোয়ার অনিক। নাটকটির মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ফারহান আহমেদ জোভান, তাসনিয়া ফারিন, তানজিম হাসান অনিক প্রমুখ। ৩১ মে এনটিভিতে প্রচারের পর হিয়া এন্টারটেইনমেন্ট নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড হয়েছে।
নাটকের শুরুতেই দেখা যায় রুমডেটের জন্য হোস্টেলের রুম থেকে ঘুমন্ত জোভানকে টেনে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পুরুষের ছদ্মবেশে সেখানে একটি মেয়ে ঢুকে। পেছন পেছন ঢুকে অভিনেতা অনিক। সেই মেয়েটির চাহনী, অভিনেতা অনিকের অঙ্গভঙ্গি আর অন্যদের লোলুপ দৃষ্টি। এরপর দরজা বন্ধ করে দেয়া। এমন জঘন্য দৃশ্য কতোটা অশ্লীলতার ইঙ্গিত করে তা আসলে বলার অপেক্ষা রাখে না। টেলিভিশনকে বলা হয় পারিবারিক ড্রয়িংরুম মিডিয়া। পরিবার নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে এ ধরনের কনটেন্ট দেখা কী সম্ভব?
খোদ অভিনেতা অভিনেত্রীরা কী পেরেছেন বাবা মাকে সামনে নিয়ে এই নাটক উপভোগ করতে? গল্পে দেখা যায় অনিক আর মেয়েটি রুমে ঢোকার পর বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে অন্যরা। জোভান বিরক্তি প্রকাশ করলে তার বন্ধু তাকেও রুম ডেট করতে বলে। সাথের আরেকজন বলে তুই সব সময় কাইল্লাডারে সুযোগ কইরা দেস কিন্তু তর এতো সুযোগ থাকলে তুই কেন কাজে লাগাস না? এখান থেকে দর্শকরা কী শিক্ষা পাবেন? প্রেম মানেই রুমডেট এর চান্স? আমাদের বর্তমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে টেলিভিশনে এ ধরনের দৃশ্য সম্প্রচার কতটা যুক্তিযুক্ত?
পরের আলাপ আরো জঘন্য রুমডেটের যন্ত্রপাতি, রুমডেট শেষে আলুথালু বেশে অনিকের বেরিয়ে আসা সবকিছুই অন্যদিকে ইঙ্গিত করে। অবস্থা থেকে মনে হবে সুযোগ থাকলে বেড সীনটাও জুড়ে দিতেন পরিচালক। কেবল ওয়েব অথবা বড় পর্দা হলে সেক্ষেত্রেও আপত্তি থাকতো না। কিন্তু টেলিভিশনে এরকম দৃশ্যকে আসলে ভয়ঙ্কর অশ্লীলতার মধ্যেই ফেলা। এরপরের গল্পটা জোভানের ফারিনের সঙ্গে রুমডেটের চেষ্টা নিয়ে। একের পর এক চেষ্টা নষ্ট হয়ে যায়। পুরো নাটকে অনলাইনে ভাইরাল রিপন ভিডিওর নানা অর্থহীন অকবিতাকে প্রমোট করা হয়েছে। এটি নি:সন্দেহে গল্পকার, সংলাপ রচয়িতার দৈন্যতা।
টিভি নাটকের বর্তমান অশ্লিলতা প্রসঙ্গে পরিচালক রাইসুল তমাল মুঠোফোনে টাইমস বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমানে ইউটিউবের আধিপত্য বিস্তারের ফলে টিভি চ্যানেলের আগের স্বাধীনতা থেকে কিছুটা হলেও পিছুপা হতে দেখা যায়। ইদানিং চ্যানেলগুলোতে এজেন্সি নাটক সরবরাহ করে বলে টিভি চ্যানেলের নাটকগুলোতে এই ব্যাপারগুলি উঠে এসেছে। অনেকেই হয়তো এজেন্সির বাইরে কথা বলতে পারেনা। প্রতিটি চ্যানেলে নাটক চালানোর ক্ষেত্রে প্রিভিউ করে তারপর চালানো উচিত বলে তিনি মনে করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যারা নাট্য নির্মাতা আছি আমাদের সবার নিজের প্রতি, দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা রেখেই কাজগুলি করতে হবে। বর্তমানে নাটকের বাজার দেশের পাশাপাশি বিদেশেও অনেক চাহিদা রয়েছে। সবাই ঘরে বসে আমাদের নাটকগুলি দেখছে। অনেকেই হয়তো মোবাইলেও দেখেন। সেখানে দেখা যায় আমার আপনার সন্তানেরা বাবা কিংবা মায়ের মোবাইল নিয়ে গেমস খেলতে খেলতে ওই নাটক এবং নাটকের অশ্লীল ক্লিপ তাদের সামনে চলে আসে। এই বিয়ষগুলি সবার খেয়াল রাখা উচিত।’
এর আগেও পরিচালক অমি’র এর “ব্যাচেলর পয়েন্ট” বরিশালের লঞ্চের একটি দৃশ্যে খুব বাজে আর অশ্লিল গালামন্দ আর নাটকটি নিয়ে ডিবি’র উর্ধতন কর্মকর্তা অভিযোগ করলে নানা ব্যস্ততার কারণে সেই বিষয়টি টাইমস বাংলাদেশের আদলে নেয়া সম্ভব হয়নি।
তবে নাটকের ইউটিউবের কমেন্ট সেকশনে গিয়েও নাটকটি সম্পর্কে প্রচুর নেগেটিভ রিভিউ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গালমন্দ দেয়া কিছু কমেন্ট তো ছাপার অযোগ্য। আসলাম খান নামে একজন লিখেছেন ‘এসব নাটক দিয়ে যুবক যুবতীকে প্রেমের নামে নোংরামি শেখানোর আইডিয়া দেয়া হলো।’ আতিক রহমান নামের একজন লিখেছেন ‘এই নাটকের পুরা জুনকে এক ঘন্টা পিটানোর দরকার। শালা গাজাখোর পরিচালক।’ সাইদুর রহমান জীবন নামের একজন লিখেছেন ‘এরকম নাটক আমাদের সমাজকে দূষিত করতেছে।’ এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হলো এই দূষণের দায়টা কে নেবে। নাটকের পরিচালক পাত্র পাত্রীরা কী কখনোই অনুধাবন করবেন না যে সমাজকে বিনোদিত করার নামে তারা আসলে সমাজকে দূষিত করছেন!
উল্লেখ্য, এ ধরনের সাবজেক্ট নিয়ে নাটক নির্মাণ প্রসঙ্গে পরিচালক মোহন আহমেদ সাথে ফোনে কথা বলতে চেষ্টা করলে তার ফোনে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
