“ওরা তো আর রেগুলার (সবার মতো) মানুষ নয়, এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কি আছে !” – বিচারালয়ে এই মন্তব্যটি করেছেন আমেরিকার উইসকনসিন রাজ্যের প্রধান বিচারপতি। সে রাজ্যে লকডাউনের আইনী বৈধতা নিয়ে শুনানী চলছিল।
লকডাউনের পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরতে আইনজ্ঞ কোর্টকে বলছিলেন – স্থানীয় একটি কারখানায় করোনা মহামারী রুপ নিয়েছে, আক্রান্ত ৬০ থেকে ৮০০ জনে ছাড়িয়েছে। আইনজীবির এমন যুক্তি-তথ্যের জবাবে প্রধান বিচারপতি মহোদয় শ্রমিকরা ‘সবার মতো মানুষ’ এই স্বীকৃতি দেননি এবং সেই আদালতের রায় ছিলো ‘লকডাউন বেআইনী’।
করোনায় আক্রান্ত, চিকিৎসা ও মৃত্যুর খবর ইতোমধ্যে গুরুত্ব হারিয়েছে। মানুষ মরছে, মরুক! অর্থনীতি বাঁচাও, সচল করো এবং এর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ো – এই রণসংগীত বাজছে সর্বত্র।
করোনায় বেসামাল আমেরিকায় মৃত্যু বেশী, আক্রান্ত বেশী। এসব নির্মম খবরের চেয়েও সেখানে লকডাউন প্রত্যাহারের কর্মকান্ড-কথাবার্তা আরো বেশী। অনেক অঙ্গরাজ্যে লকডাউন তুলে নেয়া হয়েছে , অনেক গুলোতে জোর প্রস্তুতি চলছে। লকডাউন তুলে নেয়ার নেতৃত্বের অগ্রণী সেনানী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই।
তাঁকে নিয়ে শোনা সাম্প্রতিক একটি কৌতুক এইরকম— ‘স্বপ্নে কেনেডি নাকি ট্রাম্পকে বলছেন, আমার সময়ের ফার্স্ট লেডি চ্যাতা ছিলো, তোমারও কি একই অবস্থা? ট্রাম্পের জবাব, ফার্স্ট লেডি চ্যাতা না থাকলে কি সূর্য্যে অভিযাত্রী পাঠানোর কল্পনাসহ নিত্যদিন এতসব উন্মাদনা-কথাবার্তা-করোনাকালের চালাকি চালিয়ে নেয়া যায়’ ।
এইতো দিন দশেক আগে তাঁরই অনুসারী টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের এক কর্তা বলেছেন -‘অর্থনীতি বাঁচাতে বুড়োদের মরে যাওয়াই উত্তম’।
এবার এই অভূতপুর্ব ‘রেগুলার-ইরেগুলার’ মানুষের মহার্ঘ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন, দেশটিরই একটি অঙ্গরাজ্যের প্রধান বিচারপতি। আসলেই কি বিশ্বব্যাপী শত শত কোটি এইসব শ্রমিক-কৃষক-খেটে খাওয়া প্রাণ গুলো ‘রেগুলার’ মানুষ নয়! বিশ্বকে সব অর্থেই সচল রাখতে শুধু এদেরকে প্রয়োজন ?এরা বুঝে না ক্ষমতা-পদপদবী-শাসককুল-কারখানামালিক-ব্যবসার কর্ণধার- জােত জমির মালিকসহ সবরকম প্রভুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই এদের প্রয়োজন।
এরা ঘরে বসে থাকলে মান্যবরদের চলে না। সাম্রাজ্য, বাণিজ্য, চন্দ্রাভিযান, নক্ষত্রলোক পরিভ্রমণ, রণতরীর সমুদ্রে দাপট, ক্ষেপনাস্র নিক্ষেপ , নানা কূট কৌশলী ভোগবাদীতা আর অন্যায্য যুদ্ধ, ধ্বংসলীলা, অস্ত্রের কারবার সব যে বন্ধ হয়ে যাবে-এদেরকে জীবিকার মন্ত্রে, কাজের ঘোরে না রাখলে! উদয়াস্ত পরিশ্রমী এই ‘ইরেগুলার’ বা ‘নমানুষ’ গুলো মনে করে -এরা বুঝি শুধু নিজেদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই কাজ করে!
এরা জানেনা, এদের জীবনের কোনো মুল্য নেই, এদের কিছুসংখক মরে গেলেও সংখ্যাধিক্যের কারনে তাৎক্ষণিক পূর্ণ হয়ে যাবে শুন্যস্থান ! শুধু প্রয়োজন বিদ্যমান সিস্টেমটা বজায় রাখা—কর্তাকুল এটাই চান, এই রণসংগীতই বাজাচ্ছেন হরদম এখন সবখানে।
সত্যজিৎ রায়ের “হীরক রাজার দেশে” চলচ্চিত্রের কৃষক ফজল মিয়া সুরলয়ে রাজাকে শোনাচ্ছিলেন—‘যায় যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান’
আবার খনি শ্রমিক বালারামও একই সুরে বলছিলেন—‘যে করে খনিতে শ্রম, যেন তারে ডরে যম’
না । এই পৃথিবীর শ্রমিক-কৃষক-খেটে খাওয়া মানুষ-আপনাদেরকে করোনা যম বা মৃত্যু ভয় পায় না। মৃত্যুর মিছিল দেখুন! সারা পৃথিবীময়। এটাই বাস্তবতা। কারো ভাষায় আপনারা ‘ন-মানুষ’ হলেও আপনারাই মানুষ, ওদের মতো অমানুষ নন।
আপনারা জীবনভর খেটে গেলেও কোনো দুর্যোগেই ওরা আপনাদেরকে কিছুদিনের জন্য কাজ ছাড়া খাইয়ে রাখতে পারবে না। বরং ওরা আপনাদেরকে ‘ওদের মতো মানুষ’ না বললেও ভয় ওদেরই বেশী- করোনাকেও, আপনাদের কাজ না করাকেও। আপনারা বুঝুন, আপনারাই সব, আপনাদেরকে ছাড়া ওরা কেউ নন।
পৃথিবী, সভ্যতা, উন্নতি সব অর্থহীন-অচল। আপনারা সচেতন থাকুন, কোন মন্ত্রে-তত্ত্বে, ঘোরে আপনাদের জীবনটা ঝুঁকিতে ফেলবেন না। শুধু করোনা কেন! কোনো মহামারী দুর্যোগ-দু:সময়ে আপনারা না বাঁচলে ওরাও বাঁচবে না-থাকবে না।
সেই “হীরক রাজার দেশে” চলচ্চিত্রেই শেষে রাজাই একসময় সুর মিলায় ও বলে—
‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান’
ভালো থাকুন সকলে।
– মোতাহার হোসেন চৌধুরী, কলামিস্ট, ঢাকা।
