জর্জ ফ্লয়েড কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান, ৪৬ বছর বয়সী একজন সাবেক বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তাঁর গলা ও ঘাড় শ্বেতাঙ্গ পুলিশ ডেরেক শে’ভিন ও তাঁর দলবল প্রায় ৯ মিনিট ধরে অসূরীয় শক্তিতে চেপে ধরে রেখেছিলেন । আর ফ্লয়েড বাঁচার আকুতি জানিয়ে বলছিলেন- ‘আই ক্যান্ট ব্রিদ’- আমি নি:শ্বাস নিতে পারছি না । এভাবেই জর্জ ফ্লয়েডকে মরতে হয়েছে, তাঁকে আর নি:শ্বাস নিতে দেয়া হয়নি ।
গত ২৫ মে মিনেসোটার মিনোপলিস শহরে এই ঘটনা ঘটে । ঘটনা ও ঘটনা পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার পরিস্থিতি সারা পৃথিবী দেখছে ।
মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে সহস্র শহর-নগরে ।আমেরিকা ও আমেরিকার বাইরেও । জর্জ ফ্লয়েডের জন্মস্থান হিউস্টনে হচ্ছে ব্যাপক । সহিংস রুপও নিয়েছে অনেক স্থানে । কারফিউ জারী হয়েছে আমেরিকার অন্তত: ২০০টি শহরে ।
কারফিউ ভেঙ্গেও মানুষ বিক্ষোভে শামিল । মানুষ মরেছে, নিউইয়র্কে কিছু লুটতরাজের ঘটনাও ঘটেছে । ওয়াশিংটনে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে । পুরো আমেরিকায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের হুমকি দিচ্ছেন ‘আমেরিকা ফ্রার্স্ট-শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠ’ এর ধারক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প । বিক্ষোভরত মানুষ সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকেও তোয়াক্কা করছে না । তবু ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব’ রক্ষায় যেকোন কিছু করতে ট্রাম্প চরিত্রগত ভাবেই ‘বেহায়া’ ও মরিয়া ।
যদিও আমেরিকানদের মধ্যে মুক্ত চিন্তার কিছু এলিট মানুষ ট্রাম্পকে তৃতীয় বিশ্বের কোন কোন স্বৈরশাসকের সঙ্গে তুলনা করেছেন ইতোমধ্যে । এমন কি বলছেন- ‘আমেরিকা কি তাহলে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে’ ?
আসলে আমেরিকায় বর্ণ বৈষম্য পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে ? একটু দেখা যাক – ওখানে আফ্রো-আরব-লাতিন-এশীয় কালো-ব্রাউন-হিস্পানিকদের কি অবস্থা এই কথিত সভ্য শতকেও ?
চারশো বছর পূ্র্বে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসের উপর দিয়ে শুরু সাদাদের নিপীড়ণ আমেরিকাতে । স্বাধীন-আধুনিক-‘সভ্য’ আমেরিকার জন্মও হয়েছে দেড়শো বছর পেরিয়েছে । খুব কি বদলেছে পরিস্থিতি, সাদাদের কর্তৃত্ব-নিপীড়ণ-নিবর্তন ?
এই শতকে-এই দশকে-আজকের দিনটিতেও সাদা ‘শ্রেষ্ঠরা’ ছাড়া বাকীরা নানান বৈষম্য ও নিগ্রহের শিকার দেশটিতে। আয়ের বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রের বিভাজন, বসবাসের জন্য বাধ্য হওয়া ঘনবসতিপূর্ণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবার- বিচার প্রাপ্তির রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা, শিক্ষার সংকুচিত সুযোগ সবই বিরাজমান আমেরিকাতে । এই বিদ্বেষের শাব্দিক প্রকাশ হয়তো নেই অনেকাংশে । কিন্তু ব্যবস্থাটা রয়েছে সর্বত্র । আর ব্যবস্থাটা প্রয়োগের প্রধান হাতিয়ার ‘আমেরিকা ফ্রার্স্ট’ এর গ্রেট পুলিশ বাহিনী ।
পুলিশের চোখে অপরাধ হলেই কৃষ্ণাঙ্গরা দায়ী ।প্রতিবছর আমেরিকাতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো মানুষদের এক-তৃতীয়াংশই কৃষ্ণাঙ্গ ।
বিবিসি’র দেয়া তথ্য বলছে- শুধু চলতি দশকেই পুলিশের হাতে অথবা কিছু শ্বেতাঙ্গের হাতে নিষ্ঠুর মৃত্যুর শিকার হয়েছেন- ট্রেইভান, আতাতিয়ানা জেফারসন, এরিক গার্নার, ব্রেওনা টেলর, ফ্রেডি গ্রে, মাইকেল ব্রাউন, সান্ড্রা ব্ল্যান্ড, ওয়াল্টার স্কট নামের কৃষ্ণাঙ্গ অসহায় মানুষগুলো।—-এগুলো আলোচিত হত্যাকাণ্ড, এর বাইরে রয়েছে আরো বহু । শ্বেতাঙ্গদের কথিত সভ্য রাষ্ট্রগুলোতেও পরিস্থিতি কম-বেশী একই রকম।
আমেরিকায় কালো মানুষদের গড় আয়ু কম। শ্বেতাঙ্গদের গড় আয়ু কৃষ্ণাঙ্গদের তুলনায় ৩ বছর বেশী । কারণ দেশটিতে কালোদের বাঁচার জন্য সব সুযোগই কম । পরিবেশটাই দম আটকে আসার অনুকূল । জর্জ ফ্লয়েড মরতে মরতে বলে যেতে পেরেছিলেন – “আই ক্যান্ট ব্রিদ”।
অনেক ক্ষেত্রে এই সুযোগও জোটে না । করোনায় মৃত্যুও আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদেরই বেশী—দুই-তৃতীয়াংশ । করোনার আগেই তাদের নি:শ্বাস নেয়ার সুযোগ সেখানে কম ছিল । করোনার রোগশয্যায় হয়তো তারা বলতেও পারেন নি- ‘আমার দম ফুরিয়ে আসছে !’
অদ্ভূত, এই যে নি:শ্বাস নিতে না পারার কষ্ট—এটা করোনায় মৃতদের, মৃত্যুপথ যাত্রীদের, দেশ- জাতি-ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র ভুক্তভোগী সবার ! খুবই মর্মান্তিক । এটা পথে-ঘাটে, নিজগৃহে,হাসপাতালের সিঁড়িতে-বারান্দায়, সাধারণ রোগ শয্যায় কিংবা অসাধারণ ভেন্টিলেশনে বা আইসিইউ- লাইফ সাপোর্টে, সর্বত্র। হয়তো অনেকেই ক্ষীণ ভাবেও বলতে পারেন না—‘আমি নি:শ্বাস নিতে পারছি না।’
মানুষের প্রকৃতিপ্রদত্ত শ্বাসযন্ত্র এমনই যে, এটি বিকল হয়ে গেলে আর কোন যন্ত্র, তন্ত্র, মন্ত্র, কর্তৃত্ব, দখলদারীত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব কাজে আসে না । রক্ষা কবচ হয় না—মিথ্যায়-কৌশলে- ফাঁকিতে আরোহিত মসনদ, সম্পদ, তোষামোদ, লুণ্ঠন — কোন কিছুই ।
তবুও এখনও মানুষ মিথ্যার বেসাতি, কূটকৌশল ও ক্ষমতার দম্ভ করেই যাচ্ছে অনবরত- পৃথিবীব্যাপী ।জর্জ ফ্লয়েডের নির্মম হত্যাকান্ড, বিশ্বজুড়ে করোনায় শ্বাসতন্ত্রের সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে মৃত্যু, সবই মানুষ নামে দানবদের অন্যায় ক্ষমতা বলয়ের স্বরুপ, অনিবার্য পরিণতি ।
জর্জ ফ্লয়েডের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা জীবনব্যাপী ।
তাঁর মৃত্যুতে দৃশ্যমান আলোড়ন ও করোনার শিক্ষায় সবার জন্য সমানভাবে বাঁচার – নি:শ্বাস নেয়ার জন্য উন্মুক্ত হয়ে উঠুক এই পৃথিবী । কাউকেই যেন কোথাও সরবে-নীরবে বলতে না হয়-
‘আমি নি:শ্বাস নিতে চাই’
– মোতাহার হোসেন চৌধুরী, বিশিষ্ট কলামিস্ট।
ddc99bd@gmail.com
