গত চার দশকে পুঁজিতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতা হয়েছে ব্যাপকভাবে এবং এটা পৃথিবীময় । এই নব্য উদারনীতির পুঁজির বিকাশের লাগামহীন বিশ্বায়ন ও মুনাফা অর্জনই আসল উদ্দেশ্য হওয়াতে এই পৃথিবী বেশীরভাগ মানুষের জন্যই বসবাসযোগ্য হয়ে উঠেনি। এখানে বাণিজ্যই মূলকথা। উন্নয়ন বা মানুষের কল্যাণ শুধুই বাহ্যিক আড়ম্বর, রঙীন ফানুস ও সস্তা চটকদার বিজ্ঞাপন। শিক্ষা,গবেষণা, উৎপাদন,সমাজ, রাষ্ট্র , রাজনীতি, ক্ষমতা সবই ব্যবসা-মুনাফা-কর্পোরেটদের দৌরাত্ব্যের ঘূর্ণাবর্ত ও দুর্বৃত্তায়নের সমৃদ্ধি।
চলমান এবারের করোনা মহামারীতে কর্পোরেট বাণিজ্যকেন্দিক বিশ্বব্যবস্থার নগ্নরুপ আরো স্পষ্ট হয়েছে। মুনাফা সর্বস্ব এই বর্বর সভ্যতা-কথিত উন্নয়ন মানুষকে কিছুই দেয়নি । শক্তিধর, সম্পদশালী, উন্নত রাষ্ট্রগুলোও এই মহামারীতে মানুষকে বাঁচাতে ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন, আমেরিকা ।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরুতে বলেছিলেন,করোনা সাধারণ ফ্লু- সর্দি কাশির মতো ! পরের অবস্থা সবার জানা। তিনি অনবরত প্রলাপ বকেই চলেছেন। এই শক্তিমানের নিজ দেশে ও তার অন্যান্য বহু মিত্র ও তাবেদার রাষ্ট্রের ‘হুক্কা হুয়া’ কর্মকান্ড প্রবল। কারণ দশকের পর দশক জনহিতকর কিছু এরা করেনি।
বিদ্যমান অপ বা দুষ্ট কাঠামোটা ধরে রাখা ও আরো সংহত করাটাই যে লক্ষ্য তাদের। রোগ- মহামারী রুখে দিতে কার্যকরী গবেষণায় বিনিয়োগে এদের সদিচ্ছা থাকে না, ফলে প্রতিষেধক আবিস্কৃত হয় না। মহামারী ছড়ালে ওষুধ বানানোতে আগ্রহী তারা, লক্ষ্য দ্রুত মুনাফা অর্জন । তৃতীয় বিশ্বের প্রান্তিক দেশ বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয় ! অতিশয় ক্ষিপ্রতায় এসকেএফ, বিকন, বেক্সিমকো’র ওষুধ তৈরী-বিপণনও এক সূত্রে গাঁথা, মানুষের জন্য টেকসই কোন আবিস্কার বা কল্যাণমুখী কর্ম নয় এসব! এরা চায়, অসুখ ফিরে ফিরে আসুক, আর ওষুধের রমরমা ব্যবসা হোক – রোগের পূণ: পূণ: আবির্ভাবটা বন্ধ করে দিলেতো আর লাভ নেই!
অতএব সবখানে মূলমন্ত্র একটাই- ‘পুঁজি বা বিনিয়োগ হবে শুধুই মুনাফার জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য নয় !’ এই পুঁজিতন্ত্র, তার বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিকতার কদর্য রুপ এখন সার্বজনীন ভাবে দেখছে-ভোগ করছে মানুষ । যদিও এই বর্বর-নিষ্ঠুর নীতির চর্চার প্রভাব সারাবিশ্বেই সাধারণ মানুষের উপরই বেশী। বিশ্বায়িত রাষ্ট্র গুলোতে কাঠামোগত ভাবেই সাধারণ মানুষ তথা অধিকাংশ মানুষ অধিকার-সুযোগ-সুবিধার অন্তর্ভূক্ত থাকে না। এসব রাষ্ট্রে একই রকম শাসন ব্যবস্থা ঘুরে ফিরে আসে।
এই শাসককুলরা কুলীন-শূদ্র নির্বিশেষে একে অপরের মিত্র। আসলে প্রতিক্রিয়াশীল এরাই। এরা চায়, বিরাজমান অন্যায় ব্যবস্থা যে কোনো মুল্যে টিকে থাকুক অনাদিকাল । ন্যায়ভিত্তিক, স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন পৃথিবী সাধারণের আরাধ্য হলেও দেশে দেশে এটা অধরা থেকে যায়, এইসব পুঁজিবাদের কুশলী খলনায়ক ও তাদের দোসরদের নিরন্তর ছল-চাতুরী-প্রপাগান্ডার জন্য ।
এ প্রসঙ্গে আমেরিকান দার্শনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক ‘নোয়াম চমেস্কি’ বলেছেন- “….অসভ্য পুঁজিবাদ, তার নয়া উদারনীতিবাদ, তাদের সুবিধাভোগীরা ব্যবস্থাটা রক্ষার জন্য একতাবদ্ধ । বৈশ্বিক এই সংকটের জন্য এরাই দায়ী…, এরা নুতন ফন্দিফিকিরে এই ব্যবস্থার আরো কঠোর সংস্করণ আনতে আগ্রহী..”। করোনায় সারাবিশ্ব পর্যুদস্ত হওয়া সত্ত্বেও মানুষের কল্যাণমুখী পরিবর্তনের লক্ষণ নেই পুঁজিবাদী, স্বেচ্ছাচারী, ভোগতন্ত্রী এই কপট দায়ীত্বশীলদের মধ্যে ।
যদিও কানাডাসহ স্ক্যান্ডেনেভিয়ান কিছু দেশকে এই মহামারীতে অনেকখানি ইতিবাচক ভূমিকায় দেখা গেছে। তাছাড়া কিউবা সর্বাত্বক সহযোগিতা করেছে ইতালীকে, তবে সকলেই জানে কিউবা এই পুঁজিতন্ত্রের অংশ নয়-সমাজতান্ত্রিক দেশ। দেশটি কল্যাণমুখী মজবুত স্বাস্থ্যকাঠামোর জন্য করোনা মোকাবেলায় শতভাগ সফল। কিন্তু জার্মানী ইতালীর প্রতিবেশী ও গোত্রভূক্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের সামাল দিয়ে ইতালীর জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেনি বা করেনি!
ভেনিজুয়েলাও এই মহামারী ঠেকাতে সাফল্য দেখিয়েছে। দেশটি ধনী নয়, আবার সমাজতন্ত্র আদলের সরকার থাকায় আমেরিকা ও তার দোসরদের রোষানলে রয়েছে সারাক্ষণ। কিউবা ও ভেনিজুয়েলার উদাহরণ দু’টিই যথেষ্ট অন্য সব বেনিয়াদের অন্তসারশুন্যতা উপলব্ধির জন্য। নব্য উদারনীতির পুঁজির সমৃদ্ধির দানবীয় তান্ডবের ফসল শুধু রোগ-মহামারী ও সেসব সামাল দিতে ব্যর্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বড় বিপদ অন্যখানে। যথেচ্ছ বিনিয়োগ,কর্পোরেটের ব্যাপ্তির আত্মঘাতী প্রবণতা ধ্বংস করছে জীব-বৈচিত্র।
জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে বরফ গলছে মেরুঅঞ্চলে-গলছে হিমালয়। আমাজন জ্বলে, অস্ট্রেলিয়ার দাবানল থামে না, সুন্দরবন ধ্বংসের সব আয়োজন সম্পন্ন, সারা পৃথিবীময় বনাঞ্চল-পাহাড়-নদী-জলাশয়-কৃষিজমি বিনষ্ট হচ্ছে। দুষণের নির্মমতা আকাশচুম্বী। নগরায়নের ফলে নীলাকাশ অদৃশ্যপ্রায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ঝড়-জলোচ্ছাস সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞ মতামত, দক্ষিন এশিয়ার কিছুদেশসহ আরো কিছু দেশ আগামী কয়েকদশকই বিলীন হয়ে যাবে।
সবজেনেও বৃহৎ শক্তির রাষ্ট্রগুলো,তাদের মিত্র ও লেজুররা পৃথিবীর সম্ভাব্য ধ্বংস ডেকে আনছে। তারা জানে, মানুষকে সঠিক পথ দেখালে তাদের বাগাড়ম্বর – জারিজুরি অসাড় হয়ে যাবে। তাহলে করণীয় কি ? গণশক্তির তথা বিশ্বের অধিকাংশ গণমানুষের জোটবদ্ধ প্রবল উত্থানই একমাত্র পথ। বৃহৎ আমেরিকার কিছু অংশে, ইউরোপের দক্ষিণের দেশ গুলোতে, আরো কিছু অঞ্চলে এরুপ গণশক্তিগুলো সংগঠিত হচ্ছে। পুঁজির মহীরুহ দৈত্যকূলকে রুখতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী জনকল্যাণমুখী প্রতিপক্ষ।
এরুপ গণশক্তির কার্যকর উত্থানই সম্ভব কল্যাণধর্মী ভবিষ্যত বিনির্মাণ। এটি রুশ সাহিত্যিক ‘ফিওদোর দস্তয়েভেস্কির “ হোক তা ভুল বা ঠিক মাঝেমধ্যে ভেঙ্গেচুরে ফেলা আনন্দের” আবেগ নয়। চাই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণে গণশক্তির উত্থান। ভেঙ্গেচুরে নি:শেষ হয়ে যাক বিদ্যমান অন্যায্য ব্যবস্থা। গড়ে উঠুক বাসযোগ্য, নুতন, ভবিষ্যত পৃথিবী। —-
– মোতাহার হোসেন চৌধুরী, কলামিস্ট।-ঢাকা। e-mail:ddc99bd@gmail.com
